উদ্বোধনের বছর না পেরুতেই কোটি টাকার সরকারি প্রজেক্ট ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম

দেশজুড়ে

মাহফুজুর রহমান মাসুম, উজিরপুর (বরিশাল) প্রতিনিধি ঃ
​জমকালো আয়োজনে ফিতা কেটে উদ্বোধন করা হয়েছিল কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ের খাল খনন প্রকল্প। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন খোদ মন্ত্রণালয়ের সচিব পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। উদ্দেশ্য ছিল, মৃতপ্রায় খালটিতে প্রাণ ফিরিয়ে এনে স্থানীয় কৃষিতে জোয়ার আনা। কিন্তু বছর পার হতে না হতেই সেই স্বপ্ন এখন কচুরিপানার নিচে চাপা পড়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ আর তদারকির অভাবে পুরো ১০ কিলোমিটার খাল এখন কচুরিপানার দখলে, যা উজিরপুরের কৃষকদের জন্য আশীর্বাদের বদলে এক চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
​আশার আলো যখন গলার কাঁটা
​বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার বামরাইল ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী ‘ঠান্ডা বিবির খাল’ ঘিরে স্থানীয় কৃষকদের আশার অন্ত ছিল না। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) অর্থায়নে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে এই দীর্ঘ খালটি পুনঃখনন করা হয়। উদ্বোধনের পর ভাবা হয়েছিল, এটি অঞ্চলের কৃষি, মৎস্য উৎপাদন ও নৌযোগাযোগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।
​কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে তার ঠিক উল্টোটা। খনন কাজ শেষ হতে না হতেই পুরো খালজুড়ে নিবিড়ভাবে রাজত্ব গেঁড়ে বসেছে কচুরিপানা। ফলে পানিপ্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে কালচে রূপ ধারণ করেছে খালের পানি। গৌরনদী ইউনিটের সহকারী প্রকৌশলী সাহেব চৌধুরী জানান, কচুরিপানা পরিষ্কারের জন্য আপাতত তাদের কাছে কোনো বরাদ্দ নেই।
​ক্ষুব্ধ ও হতাশ স্থানীয় চাষিরা
​সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ খালের কোথাও তিল ধারণের জায়গা নেই; সবটাই ঘন কচুরিপানায় ঢাকা। স্থানীয় কৃষক আলাউদ্দিন হাওলাদার তীব্র ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন,
​”কয়েক কোটি টাকা খরচ করে সরকার খালডা খনন করলো। আমাগো কত আশা আছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা আর নিয়মিত পরিষ্কার না করার কারণে পুরো খাল এখন কচুরিপানায় ঠাসা। পানি ব্যবহারের কোনো উপায় নাই, নৌকা চালানো তো দূরের কথা।”
​স্থানীয়রা জানান, কচুরিপানার কারণে খালের স্বাভাবিক মৎস্য সম্পদ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। আলো-বাতাস না পাওয়ায় দেশীয় মাছ মরে যাচ্ছে। এছাড়া নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৃষিপণ্য পরিবহনেও চরম বিপাকে পড়েছেন এই অঞ্চলের কয়েক হাজার মানুষ।
​অব্যবস্থাপনা নাকি অবহেলা?
​সরকারি বিপুল অঙ্কের টাকা খরচ করে প্রকল্প বাস্তবায়নের পর কেন এমন দশা—এই প্রশ্ন এখন উজিরপুরের প্রতিটি মানুষের মুখে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প শেষ করেই দায়িত্ব শেষ করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ বা কচুরিপানা পরিষ্কারের কোনো স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কোটি টাকার প্রকল্প এখন স্রেফ কর্তৃপক্ষের অবহেলা আর স্থানীয় কিছু অসচেতনতার কারণে সম্পূর্ণ ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে।
​চলতি সেচ মৌসুমে কৃষকেরা খালের পানি ব্যবহার করতে না পারলে বামরাইল ইউনিয়নের কৃষি অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। উজিরপুরের সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগী কৃষকদের দাবি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে সরকারি উদ্যোগে এই কচুরিপানা পরিষ্কার করে ‘ঠান্ডা বিবির খাল’ সচল করা হোক এবং কোটি টাকার জাতীয় সম্পদ রক্ষা করা হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *