☞ আসামি হয়েছেন ঢাকার চাকরিজীবী ব্যবসায়ী পত্রিকা কর্মচারীও!
☞ বাদী চেনেন না অধিকাংশ আসামি!
☞ আওয়ামী লীগ-বিএনপি মিলে মামলাবাণিজ্য আর দলীয় প্রতিপক্ষ ঘায়েলের অভিযোগ!
উজিরপুর (বরিশাল) প্রতিনিধিঃ
জুলাই গণহত্যায় শেখ হাসিনার ফাঁসির রায়ের মিষ্টি বিতরণে দাওয়াত পায়নি দলীয় বন্ধুরা। এ নিয়ে বাকবিতন্ডার একপর্যায়ে হয় তাৎক্ষণিক সংঘর্ষ। এতে ছুরিকাঘাতে খুন হন ছাত্রদল নেতা রবিউল ইসলাম। খুনের ঘটনাটি অপরিকল্পিত হলেও মামলা হয়েছে সম্পূর্ণ পরিকল্পিত। এতে আসামি করা হয়েছে দলীয় প্রতিপক্ষদের। আসামী থেকে বাদ যায়নি ঢাকায় অবস্থানরত চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, এমনকি পত্রিকা কর্মচারীও। মামলার বাদী চেনেন না অধিকাংশ আসামিকে। এমনই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সহ-সভাপতি রবিউল ইসলাম হত্যার ঘটনায়। সোমবার (১৭ নভেম্বর) রাতে ওই খুনের ঘটনায় বুধবার গভীর রাতে ২১ জনকে আসামি করে বাবুগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এদিকে বিএনপির এক গ্রুপের প্ররোচনায় দায়ের হওয়া ওই মামলাকে হয়রানিমূলক দাবি করে তা প্রত্যাহারের জন্য সংবাদ সম্মেলন করেছে বিএনপির আরেক গ্রুপ। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী বেগম সেলিমা রহমানের গ্রুপের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতাকে ফাঁসাতেই এই মামলাকে হাতিয়ার বানানো হয়েছে বলে দাবি তাদের। এ ঘটনায় বিএনপির বিবাদমান দুই গ্রুপের মাঝে বিস্ফোরণমুখী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

বাবুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও উপজেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি মো. আওলাদ হোসেন বৃহস্পতিবার রাতে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করে বলেন, ‘ছাত্রদল নেতা রবিউল হত্যার ঘটনাটি কোনো পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ছিল না। এটা ছাত্রদলের কিছু ছেলেদের মিষ্টি বিতরণ নিয়ে তাৎক্ষণিক ভুল বোঝাবুঝি, কথা কাটাকাটি ও মারামারির মধ্যে ঘটে যাওয়া একটি দুর্ঘটনা মাত্র। অথচ সেখানে প্রকৃত আসামি বাদ দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল এবং মামলাবাণিজ্য করার জন্য অধিকাংশ নিরপরাধ মানুষকে আসামি করা হয়েছে। মামলার ২১ জন আসামীর মধ্যে ১৪ জনই ঘটনার বিন্দুবিসর্গ জানেন না। এমনকি তারা এলাকায়ও থাকেন না। মামলার আসামি বরিশাল জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি আমিনুল ইসলাম ভিপি লিপন, জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি শফিউল আযম শাহীন, কৃষকদলের উপজেলা সহ-সভাপতি বাবুল হাওলাদার, ঢাকা মহানগর ছাত্রদল নেতা মিলন সরদার, দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার সার্কুলেশন ম্যানেজার মিজানুর রহমানসহ ১৪ জন নিরপরাধ মানুষকে এই হত্যা মামলায় সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে আসামি করা হয়েছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে টার্গেট করে দলীয় প্রতিপক্ষকে মাঠছাড়া করতে এবং মামলায় নাম কাটানো নিয়ে কোটি টাকার চাঁদাবাজি করতেই তাদের আসামি করা হয়েছে। অথচ তারা কেউই এলাকায় থাকেন না। কেউ ঢাকায় চাকরিজীবী, কেউ ব্যবসা করেন, কেউ পত্রিকা অফিসে কাজ করেন। এমনকি মামলার বাদী নিজেও অধিকাংশ আসামিকে চেনেন না। স্থানীয় ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ-বিএনপি মিলেমিশে এই মামলা নিয়ে কোটি টাকার অর্থবাণিজ্য করার জন্যই এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন তিনি।’
উপজেলার রহমতপুর বাজারে অনুষ্ঠিত ওই সংবাদ সম্মেলনে এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন বাবুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন, মাধবপাশা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি মাহবুব তালুকদার, সাবেক সাধারণ সম্পাদক সেলিম সরদার, দেহেরগতি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মিলন খান, উপজেলা বিএনপি নেতা আবুল কালাম মুন্সি, উপজেলা কৃষকদলের সভাপতি আরিফুর রহমান রতন তালুকদার, তাঁতী দলের সভাপতি জামাল হোসেন, ছাত্রদলের যুগ্ন-আহবায়ক আব্দুল্লাহ আল মামুন, জিয়া মঞ্চে সভাপতি বাহাদুর হোসেনসহ বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের বর্তমান এবং সাবেক কমিটির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী। তবে তারা সবাই বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী বেগম সেলিমা রহমানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
এদিকে এই আসনের আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনের অনুসারী নেতাকর্মীরা বৃহস্পতিবার বিকেলে ছাত্রদল নেতা রবিউল হত্যা মামলার দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে উপজেলার আগরপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন। উপজেলার ৬ ইউনিয়ন ছাত্রদলের ব্যানারে আয়োজিত ওই বিক্ষোভ কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুল মালেক সিকদার এবং উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব আরাফাত মৃধা। সমাবেশে প্রধান অতিথি আবদুল মালেক সিকদার বলেন, ‘ঘটনার ৩ দিন অতিবাহিত হলেও এখনো রবিউল হত্যা মামলার কোনো আসামি ধরা পড়েনি। আমরা এই খুনের বিচার নিয়ে শঙ্কিত। রবিউলের খুনিদের খুঁজে বের করে দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে আমরা এই বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছি। আমাদের দাবি দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে আমরা ভবিষ্যতে বৃহত্তর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করবো।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা বিএনপির এক সিনিয়র নেতা বলেন, ‘২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেগম সেলিমা রহমান এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেলেও তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হন অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। এ কারণে নির্বাচনে হেরে যান তারা দু’জনেই। গড়ে তাদের অর্ধেক ভোট পেয়ে এমপি হয় জাতীয় পার্টির গোলাম কিবরিয়া টিপু। সেই থেকে তাদের মধ্যে বিরোধ আর মেটেনি। তাদের নিয়ে উপজেলা বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনগুলো বিভক্ত হয়ে পড়ে। সেই বিভক্তির রাজনীতি থেকে গত ১৭ বছর এই দুই নেতার অনুসারীরা দলের সকল কর্মসূচি পৃথকভাবে পালন করে আসছে। বাবুগঞ্জে সেলিমা রহমান গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ইসরাত হোসেন কচি তালুকদার। আর জয়নুল আবেদীন গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন উপজেলা বিএনপির বর্তমান সভাপতি সুলতান আহমেদ খান। ২০১৮ সালে জয়নুল আবেদীন বরিশাল-৩ আসনের মনোনয়ন এবং বিএনপির সাংগঠনিক দায়িত্ব পাওয়ার পরে তিনি তার অনুসারী নেতাকর্মীদের দিয়েই উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের সকল কমিটি করেন। তাই কমিটিতে বাদ পড়ে সেলিমা রহমানের অনুসারী সাবেক কমিটির প্রায় সব নেতাকর্মী। এ নিয়ে তাদের দ্বন্দ্ব বর্তমানে তুঙ্গে উঠেছে। তাই নির্বাচনকে সামনে রেখে সেলিমা গ্রুপের জনপ্রিয় কয়েকজন নেতাকে এই সুযোগ শায়েস্তা করে এলাকাছাড়া করার জন্যই তাদের নাম রবিউল হত্যা মামলায় ঢুকানো হয়েছে। এছাড়াও চাঁদাবাজ হিসেবে সুপরিচিত বিএনপির এক নেতা মামলাবাণিজ্য করার জন্যেই কৌশলে এসব নির্দোষ ব্যক্তির নাম ঢুকিয়েছেন বলে আমরা জেনেছি।’
বাবুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহবায়ক সুলতান আহমেদ খান বলেন, ‘রাজনৈতিক দলে পদ-পদবি নিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল মতবিরোধ থাকবেই। এটা স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু সেই কোন্দলের কারণে একটি হত্যা মামলায় নিরপরাধ কাউকে আসামি করা হবে, আমরা এর মোটেও পক্ষে নই। ছাত্রদল নেতা রবিউল হত্যার সাথে প্রকৃত যারা জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই আমরা। এই মামলায় নিরপরাধ কাউকে জড়ানো হয়ে থাকলে তিনি যেন হয়রানির শিকার না হন সেজন্য আমরা পুলিশ প্রশাসনের কাছে আহবান জানাই। প্রকৃত অপরাধীর সাজা হোক এবং রবিউলের পরিবার ন্যায়বিচার পাক। আমরা উপজেলা বিএনপি এটাই কামনা করি।’
এ বিষয়ে মামলার বাদী নিহত রবিউল ইসলামের বাবা সেনাসদস্য মিজানুর রহমান দুলাল হাওলাদার বলেন, ‘আমি বিগত ২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষা মিশনে কুয়েতে অবস্থান করছি। গত ১৭ নভেম্বর রাতে আমার ছেলে নিহত হওয়ার খবর পেয়ে আমি কুয়েত থেকে বাংলাদেশে আসি। আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না। তাই আমি দেখিনি কে বা কারা আমার ছেলেকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। তবে ঘটনাস্থলে থাকা প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্থানীয় দলীয় নেতাকর্মীদের মাধ্যমে যাদের নাম এসেছে তাদের নামে আমি মামলা করেছি। আমি বহুবছর ধরে কুয়েত মিশনে দেশের বাইরে থাকায় অনেককেই চিনি না। এখন কে দোষী আর কে নির্দোষী সেটা পুলিশ তদন্ত করে বের করবে। তারা সে অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেবে। এখানে আমার কিছু বলার নাই। আমি শুধু আমার সন্তান হত্যার বিচার চাই।’
বাবুগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মো. জহিরুল আলম বলেন, ‘ছাত্রদল নেতা রবিউল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় ২১ জনের নামধরা এবং অজ্ঞাতনামা আরো ৮-১০ জনকে আসামি করে বাবুগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলার দায়ের করেছেন ভিকটিমের পিতা সেনাসদস্য মিজানুর রহমান দুলাল হাওলাদার। আমরা ১৯ নভেম্বর রাতে মামলাটি নথিভুক্ত করে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছি। এই মামলায় যদি ভুলক্রমে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি নাম চলে আসে এবং তদন্তে সেটা প্রমাণিত হয় তবে আইন অনুযায়ী অবশ্যই তিনি সুবিচার পাবেন। আমরা নির্দোষ কাউকে হয়রানি করতে চাই না। আবার কোনো অপরাধীকেও ছাড় দিতে চাই না। এই মামলায় কে দোষী আর কে নির্দোষী সেটা বলার সময় এখনো হয়নি। আমরা তদন্তে যা পাবো সেভাবেই আদালতে চার্জশিট দাখিল করবো।’
