উজিরপুর (বরিশাল) প্রতিনিধি :
বরিশালের উজিরপুর উপজেলার হারতা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সরকারি সম্পত্তি দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দখলে থাকার অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একাধিকবার উচ্ছেদ উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। সরকার পরিবর্তনের পরও সরকারি জমি দখলমুক্ত না হওয়ায় জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও ভূমি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, হারতা মৌজার ১ নম্বর খতিয়ানের ১৫১৫ নম্বর দাগভুক্ত ৫১ শতাংশ সরকারি জমির একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের দখলে রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, দখলকৃত জমিতে পাকা ভবন নির্মাণ করে বসবাসের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, ভূমি অফিসের জমি ঘিরে কার্যত একটি “আওয়ামী লীগ কলোনি” গড়ে উঠেছে। সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারে বহুবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তা বারবার ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র জানায়, বিগত সরকারের সময় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অন্তত তিনবার উচ্ছেদ অভিযানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপে সেই অভিযান বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ ও আলোচনা বিরাজ করছে।
হারতা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা পরিসংখ্যান কর্মকর্তা মোহাম্মদ নূর হোসেন বলেন,
“ভূমি অফিসের ৫১ শতাংশ সম্পত্তির মধ্যে বর্তমানে সামান্য অংশ সরকারি কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাকি জমির বড় অংশ বিভিন্ন ব্যক্তি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। সরকারি জমি উদ্ধার করে সেখানে একটি আধুনিক ভূমি অফিস নির্মাণ করা জরুরি।”
হারতা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন,
“সরকারি সম্পত্তি জনগণের সম্পদ। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে সেখানে একটি আধুনিক ও জনবান্ধব ভূমি অফিস নির্মাণ করা উচিত।”
এ বিষয়ে হারতা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা (তহশিলদার) রিয়াজ মোরশেদ জানান,
“হারতা মৌজার ১ নম্বর খতিয়ানের ১৫১৫ নম্বর দাগে মোট ৫১ শতাংশ সরকারি জমি রয়েছে। এর একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ব্যক্তি দখল করে রেখেছেন। অতীতেও উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তবে তা বাস্তবায়ন করা যায়নি।”
তিনি আরও বলেন, সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী জমিটি ভূমি অফিসের সম্পত্তি এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলী সুজা বলেন,
“সরকারি সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল করে রাখার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এদিকে উজিরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মহেশ্বর মন্ডল বলেন,
“দখলদার পক্ষ উচ্চ আদালতে মামলার ফলে
আইনগত প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। আমরা আদালতে বিষয়টি উপস্থাপন করেছি। আদালতের নির্দেশনা পেলেই প্রয়োজনীয় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।”
অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তাদের মধ্যে কয়েকজন বর্তমানে এলাকায় অনুপস্থিত থাকায় সরাসরি বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্টদের ব্যবহৃত একাধিক মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
তবে অভিযুক্তদের পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, জমিটির প্রকৃত মালিকানা ও সীমানা পুনরায় পরিমাপের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার পরই যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। অন্যদিকে, অভিযোগে নাম আসা কয়েকজন ব্যক্তি জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস ও ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন এবং প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দা, ভূমি সেবা প্রত্যাশী ও সচেতন মহল দ্রুত সরকারি জমি দখলমুক্ত করে সেখানে আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, ভূমি অফিসের কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং জনগণকে উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই সরকারি সম্পত্তি উদ্ধার করতে হবে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন— সরকারি রেকর্ডে ভূমি অফিসের সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত জমি বছরের পর বছর দখলে থাকলেও এখনো কেন তা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি? আদালতের নির্দেশনার অপেক্ষায় প্রশাসন থাকলেও দ্রুত সমাধানের প্রত্যাশা করছেন এলাকাবাসী।
