উজিরপুরে দুই ভাইয়ের দুই ইটভাটা গুঁড়িয়ে দিল পরিবেশ অধিদপ্তর

দেশজুড়ে

বিনিয়োগ ও জীবিকা হারানোর শঙ্কা, মানবিক পুনর্বাসন ও সরকারি সহায়তার দাবি

উজিরপুর (বরিশাল) প্রতিনিধি: বরিশালের উজিরপুর উপজেলার শিকারপুর ইউনিয়নে অভিযান চালিয়ে দুই ভাইয়ের মালিকানাধীন দুটি ইটভাটা গুঁড়িয়ে দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। ৮ নভেম্বর রোববার সকাল ৯টা থেকে পরিচালিত এ অভিযানে দক্ষিণ শিকারপুরের এসএসবি ব্রিকস ও পূর্ব মুন্ডপাশা গ্রামের মক্কা ব্রিকসের স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ভাটার মালিক, শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।

অভিযান চলাকালে এসএসবি ব্রিকসের স্বত্বাধিকারীর বিধবা স্ত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তাঁর স্বামী ইটভাটাটি প্রতিষ্ঠা করে প্রায় ২৫০ জনের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন ও কর্মসংস্থানের সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর রেখে যাওয়া দেনা পরিশোধের জন্য ভাটাটি মীর আরিফ হোসেনের কাছে ভাড়া দেন। কিন্তু কোনো নোটিশ না দিয়েই হঠাৎ অভিযান চালিয়ে তাঁর শেষ সম্বলটুকু মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

ভাটাটির বর্তমান ভাড়াটিয়া মীর আরিফ হোসেন বলেন, নিজের সব সম্পদ বিক্রি করে ইটভাটার ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন তিনি। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর সেই বিনিয়োগ ধ্বংস হয়ে গেছে। তাঁর দাবি, এসব ভাটায় উৎপাদিত ইট সরকারি উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডেও ব্যবহৃত হয়। তাই ভেঙে দেওয়ার আগে অন্তত দুই মাস সময় দেওয়া হলে তিনি বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ পেতেন।

অন্যদিকে, পূর্ব মুন্ডপাশা গ্রামের মীর আরিফ হোসেনের ভাই মীর সোহেলের মালিকানাধীন মক্কা ব্রিকসও একই অভিযানে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মীর সোহেল অভিযোগ করে বলেন, কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগ করে তিনি ইটভাটাটি গড়ে তুলেছিলেন। কোনো নোটিশ না দিয়েই অভিযান চালিয়ে তাঁর কোটি কোটি টাকার সম্পদ ধ্বংস করা হয়েছে।

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক কাজী সাইফুদ্দিন বলেন, সরকারি অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত সব ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইটভাটার ব্যবসা করতে হলে অবশ্যই সরকারি আইন ও বিধিবিধান মেনে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে।

অভিযানে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাদিয়া আক্তার বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী জেলার প্রত্যেকটি ইটভাটায় অভিযান পরিচালনা করা হবে। যেসব ভাটার বৈধ কাগজপত্র পাওয়া যাবে না, সেসব ভাটার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অভিযোগ পাওয়া গেলে সেখানেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ জসিম হাওলাদার বলেন, একই ইউনিয়নে দুই ভাইয়ের দুটি ইটভাটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরকারি-বেসরকারি নির্মাণকাজে ইট সরবরাহে প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি এসব ভাটার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত কয়েক হাজার শ্রমজীবী মানুষ ও সুবিধাভোগী পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয় মুদি দোকানি মশিউর রহমান মোল্লা বলেন, ইটভাটার মৌসুমি শ্রমিকদের কেন্দ্র করে প্রতি বছর তাঁর দোকানে ভালো বেচাকেনা হতো। সেই আয় দিয়েই সংসার চালাতেন তিনি। ভাটাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁর মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও আর্থিক সংকটে পড়বেন।

স্থানীয়দের দাবি, পরিবেশ রক্ষায় অবৈধ ও পরিবেশদূষণকারী ইটভাটার বিরুদ্ধে সরকারি অভিযান অবশ্যই প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। ইটভাটা পরিচালনায় আইন মানার সুযোগ তৈরি, বৈধ লাইসেন্স প্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজ করা, ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের বিকল্প কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য আইনসম্মত ও মানবিক সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জনস্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব যেমন রাষ্ট্রের, তেমনি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, যথাযথ নোটিশ, শুনানির সুযোগ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন-জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়াও সরকারি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি যেন কোনো নিরপরাধ শ্রমজীবী পরিবার জীবিকার সংকটে না পড়ে, সে বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *