উজিরপুরে মাদক রোধে আশার আলো রূপায়ণ সাংস্কৃতিক সংঘ৩১ বছর ধরে টিকে থাকা সংগঠনটি এখন অবকাঠামো সংকটে, প্রয়োজন সরকারি সহযোগিতা

দেশজুড়ে

উজিরপুর (বরিশাল) প্রতিনিধি:
মাদক, কিশোর অপরাধ ও সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধে সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আর সেই লক্ষ্যেই তিন দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করে আসছে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল ইউনিয়নের পূর্ব ধামসর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী রূপায়ণ সাংস্কৃতিক সংঘ। তবে দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত সমস্যা ও অর্থসংকটে সংগঠনটির নিয়মিত কার্যক্রম অনেকটাই থমকে আছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা পেলে সংগঠনটি আবারও শিশু-কিশোর ও যুবসমাজকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি মাদকবিরোধী সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৫ সালে পূর্ব ধামসর গ্রামের একদল তরুণের উদ্যোগে রূপায়ণ সাংস্কৃতিক সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সংগঠনটি মঞ্চনাটক, পথনাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন সামাজিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছিল। জাতীয় দিবসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক পরিবেশনাতেও অংশ নিত সংগঠনের সদস্যরা।
১৯৯৯ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে সংগঠনটি নিবন্ধন লাভ করে। নিবন্ধন নম্বর বরি-৬০২/৯৯। একপর্যায়ে সংগঠনের সদস্যদের অনেকে চাকরি ও জীবিকার প্রয়োজনে এলাকা ছেড়ে চলে গেলে ধীরে ধীরে কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়। পাশাপাশি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সংগঠনের অবকাঠামোও জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে।
পরবর্তীতে ২০২০ সালে সভাপতি মোহাম্মদ নূরে আলম ও সাধারণ সম্পাদক মোঃ মাহফুজুর রহমান মাসুম পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাদের উদ্যোগে জরাজীর্ণ ভবন সংস্কার করে সংগঠনের কার্যক্রম পুনরায় চালুর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বর্তমানে সংগঠনটির কাঠের টিনশেড ঘর ও প্রায় সারা বছর পানিতে নিমজ্জিত মাঠ কার্যক্রম পরিচালনার অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, শিশু-কিশোর ও যুবকদের জন্য খেলাধুলা, নাটক, গান, আবৃত্তি ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়ানো গেলে তাদের ইতিবাচক সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা সম্ভব। বিশেষ করে মাদক ও কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

শেরে বাংলা ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আনিচুর রহমান বলেন, সামাজিক অবক্ষয় ও মাদক প্রতিরোধে মানুষের মানসিক বিকাশের জন্য সুস্থ বিনোদনের বিকল্প নেই। রূপায়ণ সাংস্কৃতিক সংঘের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি সহযোগিতায় সচল রাখা গেলে শিশু-কিশোর ও যুবকদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হবে। প্রতিটি এলাকায় এ ধরনের সংগঠন গড়ে তোলা ও কার্যক্রম সচল রাখা প্রয়োজন।
শিকারপুর বন্দরের জয়শ্রী মণ্ডপাশা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ সেকেন্দার বলেন, শিশু-কিশোর ও যুবকদের চিত্তবিনোদনের সুযোগ সীমিত থাকলে তারা নানা ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে। সুস্থ ধারার সংস্কৃতির সঙ্গে যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করতে রূপায়ণ সাংস্কৃতিক সংঘের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় সক্রিয় করা জরুরি।
উজিরপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ রকিবুল ইসলাম বলেন, কিশোর ও যুবকদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড গুরুত্বপূর্ণ। তরুণদের সুস্থ পরিবেশে রাখার জন্য নিয়মিত সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কার্যক্রমের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
রূপায়ণ সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি মোহাম্মদ নূরে আলম বলেন, সংগঠনটির কার্যক্রম সক্রিয় থাকার সময় শিশু-কিশোর ও তরুণদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল। বর্তমানে অর্থসংকটের কারণে সংগঠনের অবকাঠামো উন্নয়ন ও নিয়মিত কার্যক্রম চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা পেলে সংগঠনটি আবারও পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মোঃ মাহফুজুর রহমান মাসুম বলেন, ১৯৯৫ সাল থেকে সদস্যদের নিজস্ব অর্থায়ন ও উদ্যোগে সংগঠনটি টিকে আছে। সংগঠনটির প্রায় ১৫ শতাংশ জমি রয়েছে। জমি ভরাট করে একটি উপযোগী মাঠ ও ভবন নির্মাণ করা গেলে নিয়মিত সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া ও সামাজিক কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হবে। এ জন্য সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদক ও কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; শিশু-কিশোর ও যুবকদের জন্য ইতিবাচক সামাজিক পরিবেশ এবং সুস্থ বিনোদনের সুযোগ তৈরি করাও জরুরি। এ ক্ষেত্রে গ্রাম পর্যায়ে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে নিয়মিত কার্যক্রমের আওতায় আনা হলে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তরুণদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
তাই দীর্ঘ ৩১ বছর ধরে টিকে থাকা রূপায়ণ সাংস্কৃতিক সংঘের অবকাঠামো উন্নয়ন, মাঠ ভরাট এবং সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পুনরায় চালুর জন্য সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতার দাবি জানিয়েছেন সংগঠনটির সদস্য ও স্থানীয়রা।
তাদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে রূপায়ণ সাংস্কৃতিক সংঘ আবারও উজিরপুরের শিশু-কিশোর ও যুবসমাজের সুস্থ বিনোদন, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং মাদকবিরোধী সচেতনতা তৈরির একটি কার্যকর কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *