বুড়ো বয়সে বাবা-মায়ের ডিমেনশিয়া: নীরবে বাড়ছে স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি

মতামত

কারণ, লক্ষণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা—যা জানা জরুরি

প্রতিবেদকঃ মোহাম্মদ তারিক উদ্দিন সিনিয়র সাংবাদিক

বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে বয়সজনিত বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের প্রকোপ, যার মধ্যে অন্যতম ডিমেনশিয়া (Dementia)। এটি কোনো একক রোগ নয়; বরং স্মৃতিশক্তি, চিন্তাভাবনা, বিচার-বিবেচনা, ভাষা, আচরণ ও দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার একটি জটিল অবস্থা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে ৫ কোটি ৭০ লক্ষেরও বেশি মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত এবং প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি নতুন রোগী যুক্ত হচ্ছে। অধিকাংশ রোগী নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বসবাস করেন। বাংলাদেশেও প্রবীণ জনগোষ্ঠী বৃদ্ধির কারণে আগামী কয়েক দশকে এই রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।

ডিমেনশিয়া কী?

ডিমেনশিয়া এমন একটি সিনড্রোম, যেখানে মস্তিষ্কের কোষ ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে একজন ব্যক্তি শুধু স্মৃতি হারান না, বরং সিদ্ধান্ত নেওয়া, পরিচিত মানুষকে চিনতে পারা, কথা বলা, পথ চিনে চলা, অর্থের হিসাব রাখা এবং নিজের দৈনন্দিন কাজও ধীরে ধীরে করতে অক্ষম হয়ে পড়েন।

সবচেয়ে বেশি দেখা যায় আলঝেইমার রোগ, যা ডিমেনশিয়ার প্রায় ৬০–৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে দায়ী।

কেন হয় ডিমেনশিয়া?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিমেনশিয়ার একক কোনো কারণ নেই। বিভিন্ন জৈবিক, জেনেটিক ও জীবনযাত্রাগত কারণ একসঙ্গে কাজ করে।

প্রধান কারণগুলো হলো—

  • বয়স বৃদ্ধি (৬৫ বছরের পর ঝুঁকি দ্রুত বাড়ে)
  • আলঝেইমার রোগ
  • মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলের সমস্যা বা স্ট্রোক
  • পারকিনসন রোগ
  • পারিবারিক বা জিনগত কারণ
  • উচ্চ রক্তচাপ
  • ডায়াবেটিস
  • উচ্চ কোলেস্টেরল
  • স্থূলতা
  • ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান
  • দীর্ঘমেয়াদি বিষণ্নতা
  • মাথায় গুরুতর আঘাত
  • শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা
  • শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া
  • সামাজিক বিচ্ছিন্নতা
  • বায়ুদূষণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
  • অপর্যাপ্ত ঘুম ও অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া

প্রাথমিক লক্ষণ

ডিমেনশিয়ার শুরুতে অনেকেই এটিকে সাধারণ বার্ধক্যজনিত ভুলে যাওয়া বলে মনে করেন। কিন্তু কিছু লক্ষণ গুরুত্বসহকারে দেখা উচিত।

যেমন—

  • একই প্রশ্ন বারবার করা
  • নতুন তথ্য মনে রাখতে না পারা
  • পরিচিত পথ ভুলে যাওয়া
  • গুরুত্বপূর্ণ জিনিস কোথায় রেখেছেন ভুলে যাওয়া
  • সময় ও তারিখ নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়া
  • হিসাব-নিকাশে ভুল করা
  • কথা বলতে গিয়ে উপযুক্ত শব্দ খুঁজে না পাওয়া
  • সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কমে যাওয়া
  • ব্যক্তিত্ব বা আচরণে পরিবর্তন
  • অকারণে সন্দেহপ্রবণ হওয়া
  • সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া

রোগের অগ্রগতিতে কী হয়?

পরবর্তী পর্যায়ে রোগীর মধ্যে দেখা দিতে পারে—

  • পরিবারের সদস্যদের চিনতে না পারা
  • নিজের বাসার পথ ভুলে যাওয়া
  • খাওয়া, গোসল বা পোশাক পরতে অন্যের সাহায্য লাগা
  • ঘুমের সমস্যা
  • উত্তেজনা বা আক্রমণাত্মক আচরণ
  • প্রস্রাব-পায়খানা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা
  • সার্বক্ষণিক পরিচর্যার প্রয়োজন

ডিমেনশিয়া রোগীরা যেসব কথা বলতে পারেন:

  • “আমার টাকা কেউ চুরি করেছে।”
  • “তোমরা আমাকে ঠকাতে চাও।”
  • “এটা আমার বাড়ি নয়।”
  • “তুমি আমাকে বিষ খাওয়াতে চাও।”
  • “ওরা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।”

রোগীর কাছে এসব কথা সম্পূর্ণ সত্য বলে মনে হয়, যদিও বাস্তবে তা সঠিক নয়।

সাধারণ ভুলে যাওয়া আর ডিমেনশিয়ার পার্থক্য

স্বাভাবিক বার্ধক্যে মানুষ মাঝে মাঝে কিছু ভুলে যেতে পারেন, কিন্তু পরে মনে পড়ে যায়। ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি প্রায়ই সেই তথ্য আর মনে করতে পারেন না এবং ভুলে যাওয়া তার দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করে।

কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?

চিকিৎসকেরা সাধারণত—

  • রোগীর ইতিহাস নেন
  • পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন
  • স্মৃতিশক্তি ও মানসিক সক্ষমতার পরীক্ষা করেন
  • রক্ত পরীক্ষা করান
  • প্রয়োজনে CT Scan বা MRI করেন
  • প্রয়োজনে নিউরোলজিস্ট বা সাইকিয়াট্রিস্টের পরামর্শ নেন

চিকিৎসা

বর্তমানে ডিমেনশিয়ার সম্পূর্ণ নিরাময় নেই। তবে সঠিক চিকিৎসা ও পরিচর্যার মাধ্যমে রোগের অগ্রগতি কিছু ক্ষেত্রে ধীর করা এবং রোগীর জীবনমান উন্নত করা সম্ভব।

চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতে পারে—

  • স্মৃতিশক্তি সহায়ক নির্দিষ্ট ওষুধ (বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী)
  • উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ
  • বিষণ্নতার চিকিৎসা
  • নিয়মিত মানসিক অনুশীলন
  • নিরাপদ ও পরিচিত পরিবেশ নিশ্চিত করা
  • পরিবারভিত্তিক পরিচর্যা

প্রতিরোধে কী করবেন?

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

প্রয়োজন—

  • নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম
  • ভূমধ্যসাগরীয় বা সুষম খাদ্যাভ্যাস
  • রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ
  • ধূমপান পরিহার
  • পর্যাপ্ত ঘুম
  • বই পড়া, দাবা, শব্দধাঁধা, নতুন কিছু শেখা
  • পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা
  • শ্রবণশক্তি কমে গেলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া
  • ওজন নিয়ন্ত্রণ
  • মানসিক চাপ কমানো

পরিবারের করণীয়

ডিমেনশিয়া রোগীর সঙ্গে রাগারাগি না করে ধৈর্য ধরে কথা বলা জরুরি।

পরিবারের সদস্যদের উচিত—

  • প্রতিদিন একই রুটিন বজায় রাখা
  • ওষুধ সময়মতো খাওয়ানো
  • বাড়িতে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমানো
  • রোগীকে একা বাইরে যেতে না দেওয়া
  • পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখা
  • স্মৃতি সহায়ক ক্যালেন্ডার, ঘড়ি ও নোট ব্যবহার করা
  • পরিচর্যাকারীর মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া।

রোগীর সঙ্গে কীভাবে আচরণ করবেন:

  • শান্ত ও ধৈর্যশীল থাকুন।
  • তর্ক করবেন না বা জোর করে বোঝানোর চেষ্টা করবেন না যে তিনি ভুল।
  • তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন। যেমন বলতে পারেন, “আমি বুঝতে পারছি আপনি চিন্তিত।”
  • হারিয়ে যাওয়া জিনিস একসঙ্গে খুঁজে দেখুন।
  • প্রয়োজন হলে অন্য কোনো বিষয়ে তার মনোযোগ সরিয়ে দিন।
  • নিয়মিত ও পরিচিত দৈনন্দিন রুটিন বজায় রাখুন।

বাংলাদেশে চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশে ডিমেনশিয়া সম্পর্কে সচেতনতা এখনও সীমিত। অনেক পরিবার রোগটিকে “বয়সের স্বাভাবিক সমস্যা” মনে করে চিকিৎসা নিতে দেরি করে। আবার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, স্মৃতি ক্লিনিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা কেন্দ্রের সংখ্যাও তুলনামূলক কম। ফলে রোগী ও তার পরিবারকে দীর্ঘদিন মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ বহন করতে হয়।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ৬০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তিদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্মৃতিশক্তির পরিবর্তন দ্রুত শনাক্ত করা এবং পরিবারকে সচেতন করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় ডিমেনশিয়া স্ক্রিনিং যুক্ত করা, প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যনীতি বাস্তবায়ন এবং পরিচর্যাকারীদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

পরিশেষে ডিমেনশিয়া শুধু একজন মানুষের রোগ নয়; এটি একটি পুরো পরিবারের চ্যালেঞ্জ। তবে সময়মতো রোগ শনাক্তকরণ, সঠিক চিকিৎসা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং পরিবারের সহমর্মী পরিচর্যার মাধ্যমে রোগীর জীবনকে আরও নিরাপদ, সম্মানজনক ও স্বস্তিদায়ক করা সম্ভব। বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিমেনশিয়া মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতা, গবেষণা এবং স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এখন অত্যন্ত জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *