ড: মইনুল হোসেন
বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গনে বিভিন্ন সময়ে তারকাদের দুঃখজনক আত্মহত্যার ঘটনা দেশের মানুষকে স্তম্ভিত করেছে। দেশের আলোচিত ও জনপ্রিয় তারকাদের এই আত্মহত্যার ঘটনাগুলো কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং আমাদের সামাজিক কাঠামোর সংকটেরও প্রতিফলন। এ ধরণের ঘটনা আমাদের সমাজের মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক দায়িত্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা।
একজন তারকার মানসিক কষ্ট, একাকীত্ব এবং স্ট্রেস প্রকাশের সুযোগ অনেক সময় কম থাকে। পরিবারের সহানুভূতি, বন্ধু ও শুভাকাঙ্খীদের সমর্থন এবং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি – এই তিনটি স্তর যদি যথাযথভাবে কাজ না করে, তবে মানসিক সমস্যা অসহনীয় ও অবহনযোগ্য হয়ে দাঁড়ায়। ২০০২ সালের ১০ নভেম্বর পোস্তগোলা বুড়িগঙ্গা ব্রিজ থেকে লাফিয়ে পড়ে মডেল তানিয়া মাহবুব তিন্নির মতো তারকার আত্মহত্যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, খ্যাতি এবং জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও মানসিক সংকট কিভাবে নিজের বেঁচে থাকাকে নিজের কাছেই অপ্রয়োজনীয় করে দেয়।
তারকাদের পেশাগত চাপ, হতাশা বা মানসিক সমস্যার লক্ষণগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী এবং মিডিয়ার সকলকে দায়িত্ব নিতে হবে যাতে তারা নেতিবাচক চাপের বা ভিত্তিহীন স্ক্যান্ডালের শিকার না হন। গণমাধ্যমের সহমর্মিতা ও সংবেদনশীলতার অভাবও কখনো কখনো আত্মঘাতী প্রবণতা বাড়াতে পারে।
রাষ্ট্রের উদ্যোগে আত্মহত্যা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেশের প্রতিটি জেলায় সুইসাইড প্রিভেনশন সেন্টার বা মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করা দরকার, যেখানে অভিজ্ঞ কাউন্সেলররা সহজলভ্য সেবা দিতে পারবেন। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যকে সামাজিক কলঙ্ক হিসেবে না দেখে নির্ধিদ্বায় সাহায্য চাওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারকাদের আত্মহত্যার ঘটনা আমাদেরকে শিক্ষা দেয় যে সমাজের প্রতিটি স্তরে দায়িত্বশীলতা ও সহানুভূতির বিকল্প নেই।
একটি সংবেদনশীল সমাজ এবং দায়িত্বশীল মিডিয়া পারে হতাশার এই অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখাতে। সামাজিক সুরক্ষা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই বিনোদন জগতের এই বিষণ্ণতা রোধ করা সম্ভব। আমাদের সবাইকে দায়িত্বশীল সামাজিক আচরণ, সহানুভূতি এবং সহায়তার পরিবেশ তৈরিতে অংশ নিতে হবে। সমাজ যেদিন মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিয়ে সামাজিক চাপ কমাবে এবং সহানুভূতিশীল পরিবেশ গড়ে তুলবে, সেদিন থেকে আত্মহত্যার মতো দুঃখজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি কমানো সম্ভব হবে।
লেখক: মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
