তিন উপজেলায় ফায়ার লাইসেন্স সেবায় জন-ভোগান্তি উজিরপুর, বানারীপাড়া ও আগৈলঝাড়ায় জনবল সংকট, একজন ইন্সপেক্টর দিয়ে চলছে কার্যক্রম

দেশজুড়ে

মাহফুজুর রহমান মাসুম, উজিরপুর (বরিশাল) প্রতিনিধি:

বরিশালের উজিরপুর, বানারীপাড়া ও আগৈলঝাড়া উপজেলায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের লাইসেন্স-সংক্রান্ত সেবা নিয়ে চরম ভোগান্তির অভিযোগ উঠেছে। তিন উপজেলায় ফায়ার লাইসেন্স-সংক্রান্ত পরিদর্শন ও যাচাই-বাছাই কার্যক্রম পরিচালনায় প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় সেবা নিতে আসা ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠান মালিকদের বারবার কার্যালয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ—দুটিই ব্যয় হচ্ছে বলে অভিযোগ সেবাগ্রহীতাদের।

উজিরপুরের ব্যবসায়ী মো. সজল মোল্লার অভিযোগ, তিন উপজেলার বিশাল এলাকার লাইসেন্স-সংক্রান্ত পরিদর্শন, যাচাই-বাছাই ও অন্যান্য কার্যক্রম সীমিত জনবল দিয়ে পরিচালিত হওয়ায় স্বাভাবিক গতিতে সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে উজিরপুর ও আগৈলঝাড়ার সেবাগ্রহীতাদের নির্ধারিত কর্মকর্তা বা পরিদর্শকের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। কখনো কখনো প্রয়োজনীয় কর্মকর্তা অন্য দায়িত্বে থাকায় কাজ পিছিয়ে যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের বরিশাল বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল জেলার উজিরপুর, বানারীপাড়া, গৌরনদী, বাবুগঞ্জ, মেহেন্দিগঞ্জ, বাকেরগঞ্জ, হিজলা ও মুলাদীসহ একাধিক উপজেলায় ফায়ার স্টেশন রয়েছে। উজিরপুর ও বানারীপাড়া ফায়ার স্টেশনের যোগাযোগ নম্বরও সরকারি তালিকায় প্রকাশ করা হয়েছে।

অন্যদিকে বরিশাল জেলা কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের তালিকায় উজিরপুর ফায়ার স্টেশনে আব্দুর রশিদকে স্টেশন অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) এবং বানারীপাড়া ফায়ার স্টেশনে লিটন হাওলাদারকে ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর (সংযুক্ত) হিসেবে কর্মরত দেখানো হয়েছে। বরিশাল কার্যালয়ে ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর হিসেবে সাইফুল ইসলামসহ অন্যান্য কর্মকর্তাও রয়েছেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ফায়ার লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের অবস্থান, ভবনের নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, দাহ্য পদার্থের ব্যবহার বা মজুদের মতো বিভিন্ন বিষয় যাচাই করতে হয়। ফলে কেবল অনলাইনে আবেদন করলেই সব প্রক্রিয়া শেষ হয় না; মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় যাচাই ও পরিদর্শনের বিষয়ও রয়েছে।

ফায়ার সার্ভিসের কেন্দ্রীয় ই-লাইসেন্স প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, ১ মে ২০২৬ থেকে ই-ফায়ার লাইসেন্স ব্যবস্থা চালু হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে পর্যায়ক্রমে সব ধরনের ফায়ার লাইসেন্সকে ই-ফায়ার লাইসেন্স ব্যবস্থার আওতায় আনার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পূর্বে ইস্যু করা লাইসেন্সও নবায়নের পরিবর্তে ‘রিঅ্যাসেসমেন্ট’-এর মাধ্যমে নতুন ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।

তবে অনলাইনভিত্তিক ব্যবস্থা চালু হলেও মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকলে সেবার গতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফায়ার লাইসেন্সের আবেদন ফরমেই প্রতিষ্ঠানটির উপজেলা, ইউনিয়ন, নিকটবর্তী ফায়ার স্টেশনসহ বিভিন্ন তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সেবাটি উপজেলা পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।

মানচিত্রভিত্তিক জোন ব্যবস্থাপনায় প্রশ্ন

বরিশাল জেলার ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় উজিরপুর, বানারীপাড়া ও আগৈলঝাড়া—তিনটি উপজেলা পাশাপাশি হলেও প্রতিটি উপজেলার জনসংখ্যা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও যোগাযোগব্যবস্থা ভিন্ন। ফলে সীমিত জনবল দিয়ে একাধিক উপজেলার লাইসেন্স পরিদর্শন ও যাচাই কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে মাঠপর্যায়ে চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

সেবাগ্রহীতাদের দাবি, বরিশাল ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মানচিত্রভিত্তিক জোন বা দায়িত্ব বণ্টন নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কোন ফায়ার স্টেশনের আওতায় কোন উপজেলা বা নির্দিষ্ট এলাকা থাকবে, কোন কর্মকর্তা নিয়মিত লাইসেন্স পরিদর্শন করবেন এবং কোথায় কতজন ইন্সপেক্টর প্রয়োজন—এসব বিষয় জনবল ও ভৌগোলিক দূরত্ব বিবেচনায় নির্ধারণ করা হলে ভোগান্তি অনেকটাই কমতে পারে।

তাদের আরও দাবি, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ফায়ার স্টেশনে পর্যাপ্ত কর্মকর্তা ও পরিদর্শক নিয়োগের পাশাপাশি লাইসেন্স-সংক্রান্ত সেবার জন্য নির্দিষ্ট দিন ও সময় নির্ধারণ করা হলে সাধারণ মানুষকে বারবার দূর-দূরান্ত থেকে অফিসে আসতে হবে না।

জরুরি সেবার পাশাপাশি লাইসেন্স কার্যক্রমেও জনবল প্রয়োজন

ফায়ার সার্ভিসের মূল দায়িত্ব অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা হলেও অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফায়ার লাইসেন্স ব্যবস্থার গুরুত্বও কম নয়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, গুদাম, মার্কেট ও বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথ আছে কি না, তা যাচাইয়ের সঙ্গে এ কার্যক্রম সরাসরি সম্পর্কিত।

তাই লাইসেন্স সেবায় দীর্ঘসূত্রতা শুধু সেবাগ্রহীতার ভোগান্তির বিষয় নয়; এর সঙ্গে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাও জড়িত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বরিশাল বিভাগের সরকারি ওয়েবসাইটে ২০২৬ সালের ২১ এপ্রিল ই-ফায়ার লাইসেন্স-সংক্রান্ত গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। একই ওয়েবসাইটে বিভাগীয় কর্মকর্তাদের যোগাযোগের তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছে।

সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, ডিজিটাল সেবা চালুর পরও মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত জনবল ও সুষম দায়িত্ব বণ্টন নিশ্চিত করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না।

আগৈলঝাড়ার ব্যবসায়ী ওমর আলী সানি দাবি করেন, উজিরপুর, বানারীপাড়া ও আগৈলঝাড়ার লাইসেন্স কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল দ্রুত নিশ্চিত, শূন্য পদে নিয়োগ/পদায়ন এবং মানচিত্রভিত্তিক জোন পুনর্বিন্যাস করে একটি নির্দিষ্ট সেবা কাঠামো চালু করা হোক। এতে একদিকে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি কমবে, অন্যদিকে অগ্নিনিরাপত্তা তদারকিও আরও কার্যকর হবে।

এ বিষয়ে বানারীপাড়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর লিটন হাওলাদার জানান, মূলত তার অফিস পোস্টিং জেলা হেডকোয়ার্টারে থাকার কথা। কিন্তু তিন উপজেলায় ফায়ার স্টেশন অফিসার না থাকায় তাকে বাধ্য হয়ে বানারীপাড়া ফায়ার স্টেশনের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এ কারণে উজিরপুর ও আগৈলঝাড়ার সেবাপ্রার্থীদেরও বিভিন্ন লাইসেন্স-সংক্রান্ত কাজে বানারীপাড়ায় আসতে হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *